অফিস থেকে ফেরার পথে সোমেশ আজকাল
এই পিছনের মাঠটা দিয়েই আসে । একটু ঘুরপথে আসতে হয়, তাও সে আসে । কোন কারণ নেই বিশেষ । পড়ন্ত বিকেলে মাঠটা থেকে দিনের শেষ লাল
সূর্যটা দেখতে ভালো লাগে তার । তাই একটু ঘুরে বাড়ী ফেরা । মাঠটাকে স্থানীয় লোকেরা
বলে হাঁসিপাহাড়ীর মাঠ । কেন বলে সোমেশ বোঝেনা । এটা তো তার বাড়ির পাশের মাঠ । এই
মাঠ দিয়ে হাঁসিপাহাড়ী যেতে হয় । কিন্তু সে তো বাংলা সীমানার ওপাড়ে ঝাড়খণ্ডে ।
মাঠটা তো এপাড়ে । তবু লোকে বলে, এবং বলতে বলতে দেশবন্ধু
পার্কের মাঠ একদিন বেদখল হয়ে যায় ভিন রাজ্যের হাঁসিপাহাড়ীর কাছে । অভ্যাসে কত কিছুই যেন এক হাত থেকে অন্য হাতের
দখলে চলে যায় । সবসময় এই দখল আর বেদখলের খেলা মনে হয় মানুষের জানার আওতার মধ্যেও
থাকে না, অজান্তেও ঘটে যায় । আসলে মানুষ সবটা নিয়ে ভাবতে চায়
না, পারেও না । সোমেশের এই মাঠ পেরিয়ে
যাওয়ার আগেই আজ প্রায় পুরো সূর্যটাকেই দিগন্ত গিলে ফেলেছে । বিজ্ঞানের ছাত্র সোমেশের এই মূহুর্ত গুলোতে
কিছুতেই বিজ্ঞানের যুক্তি মানতে বা বিজ্ঞানের নিয়ম মানতে মন চায় না । দিগন্ত সূর্য
কে গিলে খাচ্ছে । এক রূপকথার আবেশ এনে দেয় তার মধ্যে । কোথা থেকে যেন কি একটা ভালোলাগা
ছড়িয়ে পড়ে শরীরে । তার
কাছে দিগন্ত সূর্যের থেকে অনেক বড় । সূর্য একদিকে থাকে দিগন্ত চারিদিকে ছড়িয়ে ।
সোমেশের কাছে দিগন্তের রূপ ঠিক যেন তার ভালবাসার নরম শরীরটার মতো । যার কাছে পৌছতে
পারলেই,
তার কোলে মাথা দিয়ে ঘুমাতে ইচ্ছে করে আর ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই অনেক অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করে । যার ছোঁয়া এতই নরম যে মানুষের চোখে জল এনে দেয়
। না অনু কখনো দিগন্ত হতে পারবে না ।
কিছুতেই না । তার গায়ে দিগন্তের মত নরম আলো ছড়িয়ে নেই । অনু জাগতিক আধুনিকতার এক
নিষ্ঠুর ফসল । ‘অনু... অনুমিতা তুমি
কখনো দিগন্ত হতে পারবে না ।’ অসম্ভব আক্ষেপে অস্ফুটে সোমেশের
গলা দিয়ে কথাটা বেড়িয়ে এল । সোমেশ নিজেও জানে না এই দিগন্ত কোন দিনও সে ছুঁতে
পারবে কিনা ? দিগন্ত ছোঁয়া যায় না সে জানে । কিন্তু কিছুতেই মন তা মানতে চায় না
তার । ওখানেই যে তার ভালোবাসা আছে । কেন অনুকে সে দিগন্ত বানাতে পারল না । অনুর
যোগ্যতা ছিল না দিগন্ত হতে পারার নাকি তার নিজের যোগ্যতা নেই দিগন্ত ছুঁয়ে দেখার ।
একটা আস্ত দিগন্ত তৈরি করে নেওয়ার ?
‘এই যে শুনছেন, সূর্য কিন্তু কারও রাস্তা আটকায় না ।’ চমকে ওঠে
সোমেশ । অনু এখানে কি করে এলো ? পিছনে তাকিয়ে কিছুটা বিরক্তই
হল সে । নামটা আবারও মনে করতে পারল না । কিন্তু মেয়েটিকে চিনতে পারল সে । তাদের
ক্লাবে এবার নাটক করছে । একেবারে নতুন আনকোরা ।
একটা গোলাপি সাইকেলে চেপে দাঁড়িয়ে আছে
তার পিছনে । মেয়েটার এক পা সাইকেলের প্যাডেলে আর একপা মাটিতে ।
‘আজ কিন্তু রিহার্সালের
দেরি হয়ে যাবে । তখন মুখ বেঁকালে কিন্তু সবার সামনেই কেঁদে দেব ।’ বলেই মেয়েটি মুচকি হেসে দিল । ফোনের ওপারে অনুর মুখে এই হাসিটাই কি সে
দেখত পেত তার অনুমানে ? মাথায় ভিমরুল পোকার একটানা উড়ে
বেড়ানোর শব্দটা বাজতে শুরু করে সোমেশের । সে বাইক নিয়ে একেবারে মাঝখানে দাঁড়িয়ে ।
রাস্তা নয় এটা, যে পাশ কাটিয়ে কেউ চলে যাবে । মাঠের মধ্যে
সাইকেল, গাড়ি, লোক যেতে যেতে একটা সরু
জায়গায় ঘাস উঠে গিয়ে শুধু বলে, ‘রাস্তা নেই কিন্তু এখান দিয়ে
যাওয়া যেতে পারে ।’ ঠিক সরু সেই জায়গাটাতেই সোমেশ দাঁড়িয়ে ।
ক্ষণিকের বিহ্বলতায় সড়ে যাওয়া বা গাড়ী স্টার্ট দিয়ে চলে যাওয়ার কথা ভুলে যায় সে ।
সম্বিত ফেরে মেয়েটির সাইকেলেই ক্রিং ক্রিং শব্দে
। কি যেন নাম মেয়েটির ...?
ভাবতে ভাবতে সোমেশ গাড়ী স্টার্ট দিয়ে এগিয়ে যায় । মনে মনে স্পষ্ট
বুঝতে পারে অনু তাকে নিয়ে আজও মজা পায় । তার রূপ আর সচ্ছলতার অহংকারে অন্য সবাই কে
অনেক নীচে দেখার এক অনাবিল আনন্দের হাসি ।
বাড়ীর গলিতে ঢুকে সোমেশ গাড়ী আসতে করে
একবার পিছনে তাকায় । মেয়েটি কি এখনও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছে নাকি ? না গলির মুখ বেঁকে যাওয়ায় সে আর মাঠটা দেখতে পায় না ।
গাড়ী গ্যারাজে রেখে সে হুড়মুড় করে ঘরে ঢোকে । কাঁধের ব্যাগটা চেয়ারে রেখেই
বাথরুমে যায় । হাত পা ধুয়ে আসে । সোমেশের মা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে,
‘এত তাড়াহুড়োর কিছু নেই । রিহার্সালের এখনও আধা ঘণ্টা বাকি ।’
মা রান্না ঘরে চলে যায় ।
সোমেশ ব্যাগ নিয়ে দোতলায় তার ঘরে চলে আসে ।
সকালে জানলাগুলো বন্ধ করে যেতে ভুলে গেছে । তার মানে আজ সারারাত মশার গান শুনতে
হবে তাকে । খোলা জানলায় দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরায় সে । আজ তিন নম্বর রিহার্সালের
দিন । মোট চব্বিশটা দিন সে পাবে
রিহার্সালের জন্য । এর মধ্যে এই প্রায় নাটক না করা আর বেশ কিছু নতুন ছেলে
মেয়েদের নিয়ে কি নাটক শেষ করতে পারবে সোমেশ ?
ভেবেছিল আজ
একটু আগে বাড়ী ফিরে একটা হোম ওয়ার্ক করে নেবে কতদিনের মধ্যে কি কি কাজ শেষ করতে
হবে ।
জানলায় একটা পাখি ডেকে ওঠে । চকিতে সোমেশের চোখ
খুঁজে নিতে চায় এই না শোনা ডাকের সাঁঝ পাখিটাকে । কে ডাকে ,
কে ডাকে এভাবে অচেনা সুরে ? কি নাম , কি নাম রে পাখি তোর ? কি নাম ঐ মুচকি হাসির মেয়েটির ?
কি যেন নাম তার ? কেন সাইকেলে ছেলেদের মত
মাটিতে পা দিয়ে দাঁড়ায় সে ? সে কি জানে না মেয়েদের কিছু
জিনিষ মানায় না । মেয়েদের নমনীয়তা কিছু তো দাবী রাখে প্রতিটি মেয়ের কাছে । কিছু
সুন্দর, কিছু সাবলীল প্রতিচ্ছবি । আবার ডাকিস কেন তুই পাখি ?
কোথা থেকে ডাকিস ? কেন এই সাঁঝ বেলায় ডাকিস ?
‘অনু আজও কি তুমি আমায় ডাকো
? কথা বল কিন্তু সেই ভাবে কি ডাকো আমায় ?’ সোমেশ নিজেকেই নিজে অস্ফুটে প্রশ্ন করে ওঠে ।
কিন্তু এখন একজন ডাকছে । তার ডাকেই সোমেশের চোখে জল
বইতে গিয়েও থমকে যায় । মা ডাকছে, ‘ খেতে আয় । চা
বসিয়েছি । দেরি করিস না । এরপর আবার না খেয়েই চলে যাবি তখন ।’
সোমেশ তাড়াতাড়ি জামা কাপড় বদলে নিচে যায় । টেবিলে
মা খাওয়ার রেখে চা করছে রান্না ঘরে । তার সাথে আজকাল মহিলার খুব কম কথা হয় । অথচ
একসময় সোমেশ বাড়ী ফিরেই মা’কে সারাদিনে যা যা সে
দু’চোখ দিয়ে দেখল, প্রতিদিন তা
সবিস্তারে বলত । কি করে চারপাশের সমাজটা কত দ্রুত বদলে যাচ্ছে । মানুষ গুলো কেমন
সবাই অচেনা হয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে । তার সব ভাবনার জালে মা’কে
সারাদিন জড়িয়ে রাখত সে । ভুল বললে মা আপত্তি করত খুব । তর্ক বেঁধে যেত মায়ের
সাথে । ইচ্ছে করে সোমেশ আরও বাড়তে দিত সে তর্কগুলোকে । বুঝে নিত চাইত,
তার চোখ দিয়ে দেখা আর মাথা দিয়ে ভাবার পর মন দিয়ে সে যা বুঝত,
যা বুঝেছে তা ঠিক কিনা ? অনেকবার মা তার অনেক
ভুল ধরিয়ে দিয়েছে । সোমেশ মনে মনে মায়ের অভিজ্ঞতার মূল্য শুধু সন্মান আর শ্রদ্ধা
দিয়েই নয় ভালোবাসা দিয়েও দিয়ে এসেছে আজ অবধি ।
কিন্তু গত দুই বছর নিচে খুব একটা
থাকেই না সোমেশ । বাড়ী ফিরেই নিজের দোতলার ঘরে চলে যায় । একা থাকতে তার ভাল লাগে
আজকাল । কথা সে ছোট বেলা থেকেই কম বলত ।
আজকাল আর বলতে ইচ্ছে করেই না । আগে তাও মনের মত বিষয়ে কথা উঠলে আর পছন্দের লোক
আলোচনা করলে সেও বেশ যোগ দিত তাতে । লাইন ছেড়ে বেলাইনে না পৌঁছালেই সোমেশের যে কোন
আলোচনায় আগ্রহ ছিল খুব । আজকাল আর সে সব ভাল লাগে না । জীবনের মধ্য সময়ের বেশী পার
করে এসে হটাৎ কেন জানি মূল্যবোধ, শিক্ষাদীক্ষা, তার অনুভব করার ক্ষমতা সব কিছুই এক জটিল প্রশ্নের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে । সব
কি ভুল তার ?
সোমেশ এত সযত্নে দু চোখ দিয়ে দেখে দেখে অনুভব
করে করে শিখে রাখার যে ফসল এত কাল ধরে মনে মগজে সারা শরীরে জমা করেছে, যা তার কাছে তার দ্বিতীয় সত্তা , আজ মাত্র কয়েকদিনেই
তা সব ভুল হয়ে গেল ? এতই কি ঠুনকো ছিল তা ?
টেবিলে মা
চা রেখে গেল । সোমেশের ইচ্ছে হল মায়ের হাতটা ধরে বুকে মুখ গুজে অঝোর ধারায় কেঁদে
নিজেকে একটু হাল্কা করতে । কিন্তু আজকাল সে যা ভাবে তার কিছুই করতে পারে না । অনেক
কিছুই হাতের সামনে থাকলেও ছুঁতে পারেনা, চোখের
সামনে থাকলেও দেখতে পায়না । নিজেকেই কেমন নতুন লাগে । বাইরের সোমেশের সাথে যেন
ভিতরের সোমেশের মিল হয়না । তারা চুপ করে থাকেও না। সারাক্ষণ নিজেদের মধ্যে লড়াই
করে যাচ্ছে । আর প্রতিনিয়ত এই দুই সোমেশের লড়াই-এ সোমেশ শুধু ক্লান্ত হয়,
অসুস্থ হয়, বয়সের তুলনায় বুড়ো হয় তাড়াতাড়ি ।
‘রবি এই চিঠিটা দিয়ে গেছে ।’ মা একটা ভাঁজ করা কাগজ
এগিয়ে দেয় । সোমেশ জানে এটা কি । তাই না খুলেই পকেটে ঢুকিয়ে রাখে প্রথমে বলেছিল
যাবে না । পড়ে আবার লোকাল সম্পাদক ফোন করে বলল বিশেষ দরকার আসতেই হবে । আজ মনে করে
রিহার্সালে সবাই কে বলে দিতে হবে কাল সে থাকবে না । কে দায়িত্ব নিয়ে চালাতে পারবে
ভাবতে ভাবতে চা খেতে লাগল সে ।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সে কোন রকমে শেষ করে চা । চটি পড়ে মা কে বলে,
‘দেরি হবে না চিন্তা কোর না । আসছি । দরজাটা দিয়ে দাও।’
গেট পেড়িয়ে রাস্তায় এসে সোমেশ
একটু হিসেব করে নেয় কতটা জোরে হাটতে হবে ঠিক সময়ে পৌছাতে হলে । সময়ের থেকে
ইচ্ছেকৃত ভাবে কোথাও দেরি করে পৌছাতে তার খারাপ লাগে । সে শেষ ঘড়ি দেখল যখন তখনও
কুড়ি মিনিট সময় ছিল । তারপর সে শুধু চা’য়ের কাপটা টেবিলে রেখে চটি পড়ে বেরিয়ে এসেছে
। খুব
বেশী দুই বা তিন মিনিট লেগেছে তার । পাঁচ মিনিট ধরলেও এখনও পনেরো মিনিট । না আসতে
আসতে গেলেও সে সময়ের আগেই পৌচ্ছে যাবে । গিয়ে দেখবে এ আসেনি । ও ফোন করছে এখনি আসছি
এই রাস্তার মোড়ে ।
নাম টা এখনও সোমেশের মনে পড়ছে না কিন্তু ঐ মেয়েটি প্রতিদিন ঠিক
সময়েই আসে । মুখ বেঁকালে সে কেঁদে দেবে বলল কেন ? এটা কি ধমকি দেওয়া হল তাকে ?
সোমেশ অজান্তেই একবার তার মুখে হাত বুলিয়ে নেয় । তারপর তাড়াতাড়ি পা চালায় । আজ সে
মেয়েটার আগেই পৌছাবে । মেয়েটি দেরি করে এলে একবার নিজেকে দেখে বোঝার চেষ্টা করবে
মুখ বেঁকানো মানে কি ? কি করে সে মুখ বেঁকায় ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন