আজ উনত্রিশ । মানে আরও দুদিন
।কৌটো মেপে চাল দেখল । দুজনের দুবার হবে ।ঝুড়িতে পড়ে ছ’টা আলু দু’টো পেঁয়াজ । কাঁচা লঙ্কা আদা নেই । ডিম
মাত্র একখানা । ডিম ভেজে টুকরো করে নেওয়া যাবে । ডিম ভাজার টুকরো দিয়ে আলুর দম ।
বাটনা করাটাই কঠিন, বিশেষত শুকনা লঙ্কা । চিনি চা পাতাও অল্প
। কি করে চলবে ? চেহারা বড়সড় হলে কি হয়,
মুখ দেখলেই বোঝা যায় উনিশ কুড়ির বেশী নয় । গর্ভবতী । দেহের মাঝখানটা
কিছুটা ভারী । হয়ত সেজন্যই প্রায় সবসময়ই একটা খিদের বোধ সোমার সঙ্গী । প্রতি মাসেই
শেষ দু একটা দিন টাকায় টান পড়ে । হিসেব বুঝে চালাতে পারেনা দুজনেই, আচমকা খরচ হয়ে বিপদে পড়ে । সকালবেলা বরাদ্দ চা মুড়ি । সাড়ে ন’টায় ভাত খেয়ে বেড়িয়ে যেতেই, যা থাকে হামলে পড়ে খেয়ে
নেয় সোমা । এরপর দীর্ঘ দুপুর । বইপত্র ছাড়া কথা বলার কেউ নেই । কেবলই খিদে পায় ।
কিন্তু কি খাবে ? রকমারি বানাতে জানে না সোমা । সে
সঙ্গতিও অরুণের নেই । পরিশ্রমী পূর্ণবয়স্ক মানুষটিকে ভরপেট খেতে দিতে না পারলে
স্বস্তি পায়না সোমা । লোকটা একটু পেটুকও । ভালোবেসে সোমা নিজের ভাগটাও এগিয়ে দিলে
সামলাতে পারেনা, খেয়ে নেয় । সৎ সরল মনখোলা অরুণ,
যাবতীয় মানিয়ে নেয় সোমা ।নিঃসঙ্গ দুপুরে কাছে ফেরে আরণ্যক
কৈশোর । অরুণের আসঙ্গের অবকাশে, এই প্রিয় পরিবেশ
পরিজনের স্মৃতিতে ভ্রমণ ছাড়া আর কিছু নেই । রেডিও আছে । কিন্তু যা শোনা ধাত নয় ।
রুচির প্রশ্নে স্পর্শকাতর । ফলে রেডিও পরিপূর্ণ নন্দন দিতে পারেনা সোমাকে । নিজেকে
বন্দি লাগে তার ।ক’দিন আগে দরখাস্ত লিখতে বসে ইংরাজি অভিধান খুলেছিল, হটাত
মজায় হেসে উঠে অরুণ ডাকল, ‘সোমা-!’ খবরের কাগজের কোণায় একটা মুখ এঁকে
কলমের আঁচড়ে তাতে আলোছায়া খেলাচ্ছিল সোমা । চুলের ঝুরির ফাঁক থেকে মৃগ দৃষ্টিতে
বলল,
‘কি-?’ বিশেষ আদর ঢেলে অরুণ বলল,
‘ একটু এদিকে এসো না-?’ ‘বল না--!’ বলতে বলতে চুলের আড়ালে মুখ চলে
গেল । সোমা উঠে এলো না দেখে কিছুটা ভাঁটা পড়লেও বিষয়টা বোধহয় অপ্রতিরোধ্য ছিল,
অরুণ বলল, ‘ইংরাজিতে তোমার নামের মানে কি,
দেখে যাও! --’ মাথা তবু নিচু,
অন্য মনে সোমার উত্তর, ‘তুমিই বল না--!’ মজাটা সোমাকে নিয়েই,
অরুণ বলল, ‘এই যে দেখো ইংরেজিতে এস. ও. এম. এ.
সোমা মানে, বডি, দেহ। খুব যে সব সময় না
না কর, তোমার নামের মানেটাই যে —’ শেষ হল না অরুণের,
ভয়ংকর চটে বলে উঠল সোমা ‘অ্যাই ! খবরদার ! আর
একবারও বলবে না ! —’ উদ্দেশ্য সিদ্ধ । শরীর প্রসঙ্গে
একটা শিল্পিত মৌনতা, সেখানে ছোঁয়া লাগলে
প্রতিক্রিয়া দেখায় সোমা । তখন তাকে অসামান্য লাগে অরুণের । সোমার মনোজগৎ ভাল বুঝতে পারে না, একটি মেয়ের অধরা রহস্যকে স্বামিত্বের দাবীতে আয়ত্ত করতে বিশেষ উন্মাদনা
বোধ করে ।আজও তাই হল । সোমার কেন্দ্র
স্পর্শ করতে ইংরেজি অভিধার্থ কাজে লাগাল অরুণ ।সকলে বলে বড়ো মানিয়েছে দুজনকে ।
অথচ কি দুস্তর প্রভেদ ওদের । অরুণের খিদে
মেটে,
দেহের সঙ্গে মনও তৃপ্ত হয় । সোমার খিদে মেটে না, দেহে অন্তর্বর্তী হয়েও মনে বন্ধ্যা বোধ করে ।দিন বুঝেই ডুব দিয়েছে সবিতার মা ।
উনোন ধরানোটাই কঠিন । আতঙ্ক, ঘুটের বাক্স থেকে
কি যে বেড়িয়ে আসবে । শিখেছে, ছ’টা
ঘুটের একটা ঘর বানাতে হবে উনোনের বুকে । ভেতরে কেরোসিন ভেজা একফালি কাপড় ।
জতুগৃহের মাথায়, প্রথম স্তরে পোড়া গুল, দ্বিতীয় স্তরে কাঁচা কয়লা । এবার হাঁ মুখে কাগজ জ্বালিয়ে গুঁজে দিলে,
ঘুঁটে ঘর জ্বলে, স্তরে স্তরে জ্বালিয়ে দেবে
প্রধান জ্বালানি । সোমার বিপদ সব কিছুই নিখুঁত ভাবে পালন করেও,
সোমার জতুগৃহ ব্যর্থ হয় । প্রচুর ধোঁয়া সত্ত্বেও গুল- কয়লা নিস্তেজ,
ঘুঁটে ছাই হয়ে ধসে বসে যায় লোহার পাঁজরে। উনুন জ্বলে না । খুব হতাশ
লাগে সোমার । অকুস্থলে থাকলে স্বনির্বাচিত পরিচালক হিসাবে একটানা মন্তব্য করতে
থাকে অরুণ । সমস্ত ব্যাপারটা সোমার অপদার্থতা প্রমাণ করেই ক্ষান্ত হয় । এটাই দুঃসহ কথার খোঁচা একেবারে
সাইট পারেনা সোমা। আদর ভালোবাসার রীতিই অরুণের এইরকম । ছোটখাটো খোঁচা দিয়ে আগ্রহ
প্রকাশ করে । ভেতরটা তখন থরথর করে কাঁপে সোমার । বাপের বাড়ীতে কেউ গলা তুলে কথা
বললেও বিপদ । অনশন শুরু । অথবা
বাড়ী ছেড়ে দৌড় । কাছেই ইস্কুল চত্বরে ঘন প্রাচীন গাছপালার ফাঁকে সারাদিন একা একা
ঘুরে বেড়ানো । নইলে দু মিনিটের দৌড় পথ নদী, ঢাল
বেঁয়ে জলের কাছে নেমে, আকন্দ গাছের আড়ালে সেই পাথরটাতে বসে
জলে পা দোলানো । এমনও হয়েছে, রাগ করে তেতলা ছাদে উঠে লাফিয়ে
কার্নিশে নেমে মাঝরাত অবধি লুকিয়ে থাকা । সকলে খুঁজে অস্থির । এখন মা হতে চলেছে সোমা । সংসারে
অর্থ কষ্ট । কোন মুখর দাবী নেই বলে তিক্ততা হয়না । কিন্তু নিরন্তর মন খারাপ লাগে ।
খিদে পায় । সে কি শুধু জঠরেরই ? লেখাপড়ায় মেধাবী আগ্রহী,
বিয়ে হয়ে তাও বন্ধ । সিনেমা বা ভ্রমণের সংস্থান নেই । এমন কি
মফস্বলের জনবসতির ধারে জাতীয় সড়কের বৃক্ষ সারিতে উজানে হাটার তুচ্ছ সাধটুকুও অপূর্ণ। পাল বাবুদের ছায়াচ্ছন্ন পুকুর
পৈঠায় বসে কলমি ঝাড়ের মাথায় ফড়িংয়ের ব্যস্ততা, ডাহুকের মন
খারাপ করা ডাকের ছন্দে পুকুরের ঢেউয়ে আলোর কারুকাজ, এটুকুও
পাওয়া হয়না । নিন্দেতে
অস্থির করে তোলে লোক । বলে, ‘নতুন ভাড়াটে বউটার
বড্ড দেখানিপনা—’ চরম আঘাতে সেদিন একটা নিন্দের
শব্দ শিখল সোমা । পাঁচিলের ওধারের গাছপালা ঘেরা বাড়ির মাসিমার কাছে । অবিবাহিত
মধ্যবয়সী মেয়ে ও তরুণ ছেলে নিয়ে মাসিমার সংসার । ওপার থেকে দিদিটি প্রায়ই ডাকেন,
‘ এসো একদিন ! পাশাপাশি থাকো, কোথায় সব সময়
যাওয়া আসা করবে বাড়ির লোকের মতো, তা না তোমাকে এতবার সাধতে
হচ্ছে ! খারাপ লাগে না তোমার একা একা ?’ এ যে কথার কথা বোঝেনি,
কথার কথা বোঝে না সোমা । ধরতে পারে না, সোমার
ব্যক্তিগত তত্ত্বগুলি ঘেঁটে কৌতূহল মেটানো, অবসর কাটানো এবং
প্রয়োজনে তাকে বিকৃত করে আঘাত হানার অস্ত্র সংগ্রহই এইসব আপ্যায়নের উদ্দেশ্য ।
কূটনীতির সহজ শিকার আরণ্যক সোমা ।সরল মনে গিয়েছিল । দিদি গান করেন,
ভাই সরোদ শেখেন । রেকর্ডপ্লেয়ার আছে ওদের । সোমার পছন্দের রেকর্ডও ।
দিদি বললেন, ‘ দেখ, এই যে এলে কি ভালো
লাগল বল দেখি ? গানবাজনা এতো ভালবাসো, রোজ
রোজ চলে আসবে, নিজেই বাজিয়ে শুনবে –’ দুই সপ্তাহে তিনবার গিয়েছিল ।
তিনটে বিকেল নিজস্ব কল্পনাভূমিতে বিচরণ করেছিল সোমা । সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে কোন
হারানো ভূমি হাতড়ে মরেছিল । কয়েকদিন বাদে চতুর্থ বার যেতেই,
দিদিটি আড়ষ্ট। মাসিমা রূঢ় মুখ, ভাইটি বেড়িয়ে
যাওয়ার পথে কুণ্ঠিত মুখে বললেন, ‘একটু কাজ আছে ।’ ওর উপস্থিতি নিয়ে সচেতনতাই ছিল না সোমার । খটকা লাগলেও সহজ ভাবে বলল,
‘ এই বাড়ীটা কিন্তু খুব সুন্দর মাসিমা । গাছপালা, বাগান । শুধু চার দেওয়ালে আটকে থাকতে আমার ভালো লাগেনা, জানেন ? প্রাণ হাঁপিয়ে ওঠে।’ অতর্কিত তিক্ত গলায় মাসিমা মাসিমা
বললেন,
‘মেয়েছেলের এতো গস্তানি ভাল নয় বাছা । স্বামী নিয়ে সুখে আছ, পেটে বাচ্চা, তোমার এত বাইরে নজর কেন ? মা শেখাননি ? এক মেয়ে বুঝি ?’ দারুণ চোট লাগল । দিদিও অপ্রতিভ ।
মাথা নিচু করে লাল শান বাঁধানো মেঝেতে একটা আঁকাবাঁকা দীর্ঘ ফাটা দাগ দেখতে পেল
সোমা । গস্তানি শব্দের মানে সে জানেনা, কিন্তু
কিন্তু অপমানজনক যে, বুঝতে দ্বিধা করল না তার স্পর্শকাতর মন
। গলায় জমা-কান্না । কোনরকমে একটা ভেজা হাসি দিয়ে বলল, ‘আসি
মাসিমা—’ বাড়ি ফিরে ঝাঁপিয়ে বালিশে মুখ
গুঁজল । অলক্ষ্য কাউকে প্রশ্ন করল, ‘মেয়ে
বলেই কি এই অকারণ অপমান ? মেয়েদের কি একটি স্বাধীন আকাশ
থাকতে নেই ? সেতো শুধু মেয়ে নয় সে যে একজন সুস্থ নীতিবান
চিন্তাশীল মানুষও । এটা কি কোন অপরাধ?’ মা বলতেন ‘যাচাই করে মিশবি সোমু ।’ কিন্তু যাচাই করতে মন চায়না
সোমার । বাবা বলতেন, ‘ দেখ সোমু, লোকে
গুরুকেও বাজিয়ে নিতে চায় । যাকে বিশ্বাস করে গুরু ডাকলি, তাকে
বাজিয়ে নিতেই যদি জানবি তো তিনি আর গুরু কিসে ? ঘা খেয়েই
জীবন কে চিনতে হয় সোমু ।’ সোমাকে জীবন ঘা দিতেই চাইছে ।
প্রত্যাঘাত করবে না সোমা । শুধু প্রতিবাদ-প্রশ্ন রাখবে,
এই লুকোচুরি দামাদামি দলাদলি চালাকি অন্তর্ঘাত কেন ? কি প্রমাণ করে কি পেতে চাওয়া ? আদর করে ডেকে এতো
হেনস্তা কেন ? কেঁদে ফেরা ছাড়া কি পথ রইবে না সোমার ?
কেন কেউ বোঝে না, মন মেলে দিলে কি আনন্দ ।ক্রমেই গুটিয়ে যেতে থাকে সোমা ।
বাইরের লোকের অন্তর্গত জঙ্গলে ফাঁদে পড়া অসহায়, চেয়ে
থাকে ব্যাধের মুখোমুখি । তবু কপটতা নীচতার কাছে নিচু হয় না । তার সুষমায় রুচি নয়,
সে একটি মেয়ে, বিবাহিত, গর্ভবতী,
শুধু এই তার পরিচয় ? সে কি টিনের মুড়ি,
বেশি বাতাস পেলে ম্রিয়মাণ অভোগ্য হয়ে পড়বে ? সে
কি পেন-ঘড়ি-রুমাল, জাঙ্গিয়া-পাপোষ-থুকদান, ফুলদানির ছেঁড়া সৌন্দর্য ? কেন তার সত্তার স্ফুরণ
তর্জনী চেপে বন্ধ করে দিয়ে তোতাবুলি শেখাতে চাইছে এই স্বৈরমনস্ক সমাজ প্রতিভূরা ? বাবাকে মনে পড়ে । কেউ না থাক,
দূরে কোথাও বাবা তো আছেন । নেজের নামের ইংরেজি অর্থে বন্দী হবে না
সোমা কিছুতেই । বাবা লিখেছেন, ‘নিজে নিজেই পড়া চালিয়ে যা
সোমু । এর চেয়ে বড়ো আকাশ আর নেই—’ বাবা কি বোঝেন না যে এই তাল লয়ে
সোমার মূল সুর বসে না ? একই স্বার্থ, দুঃখসুখ নিয়ে পথ চলতে হবে তাকে অরুণের সঙ্গে । পরিমণ্ডলের সঙ্কীর্ণতার
চাপে এই যাপন যে খোঁচা হয়ে উঠেছে সোমার কাছে । কই অরুণের কাছে তো একই আচরণ আশা
করেনা কেউ । যা দেওয়ার তা দিলে ধন্য ধন্য করা হয় অরুণ কে, আর
প্রাপ্য কে পেতে হলেও কৃতকৃতার্থ থাকতে হয় কেন সোমাকে ? স্টোভ ধরিয়েই রাঁধতে হবে আজ ।
কেরোসিন কি যথেষ্ট আছে ? ডিমভাজার টুকরো দিয়ে
আলুর দম । আদা নেই, আদা বাটা ছাড়া কি দাঁড় করানো যাবে
রান্নাটা ? শুধু এই দিয়ে খেতে কষ্ট হবে না অরুণের ? নাঃ ওকে বুঝতে দেওয়া যাবে না আজ কি তোলপাড় চলছে সোমার নিজের ভিতরে । শান্ত হতে চায় সোমা । নিজেকে ধমক
দেয়,
বোঝায় । ছেলেবেলা থেকেই সে গভীর ভাবে ভাবতে চেয়েছে, ঈর্ষা দ্বেষ থেকে দূরে থাকতে চেয়েছে । হয়ত সেই জন্যই বঞ্চনার আড়ালে চোখ
ঢাকতে হয়েছে সোমাকে বারবার ।বাবার চিঠি পেয়েই আজ এই অস্থিরতা
। চিঠির শব্দ গুলো তার মনের, তার অস্তিত্বের
মূল কে আজ আবার নাড়িয়ে দিয়েছে । বাবা
লিখেছেন, ‘ সোমু, বিয়ে হয়েছে তবুও তুই
সেই ছোট্টটিই রয়ে গেলি ? অব্যবস্থার মধ্যে বিদেশে চাকরি
বাঁচাতে পড়ে আছি । এই জঙ্গলে ভালো একটা ডাক্তার পর্যন্ত নেই । তোর এই অবস্থায়
এখানে এনে রাখার সাহস পাইনা যে মা । তোর মনোবেদনা নিরন্তর আমার মনে বাজে । কিন্তু
কি করি ? নিরুপায় যে আমি ? সেই যবে
কথাও বলতে পারতিস না ভাল করে, কাঁধে নিয়ে বেড়াতে বেরুতুম,
বলতুম, সোমু একটা সত্যি পাখি । কি বুঝতিস জানি
না, সুর করে উত্তর দিতিস , হুঁউউউউউ !
আজও বলতে চাই মা, তোকে যে সীমাবদ্ধতাকে জয় করতেই হবে । কিসে
কম তুই কারও থেকে ? কার কাছেই বা কি প্রত্যাশা তোর ? সমুদ্রে পেরিয়ে দেশান্তরে যেতে হবে বলতুম । দুঃখে মন ভারী থাকলে ভ্রমণ হবে
কি করে ? বাইরের মনের মতো পাওনা নিজের মনেই খোঁজ মা । মনে আছে শ্রী-গীতার
কথা ?
‘যেভাবে নিযুক্ত হব সেভাবেই করব’ । ইস্কুলের পত্রিকাতে
এই নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছিলি, ধন্য ধন্য বলে যেত
লোকে বাড়ী বয়ে এসে । কি গর্বই যে হয়েছিল
আমাদের। আমার আর্থিক দৈন্যই হয়ত তোর
দুঃখের মূল । কিন্তু জীবন কি এভাবেও পরীক্ষা নেয় না মা—’ বাবার চিঠির জন্যই নাকি
পেঁয়াজ কাটতে এতো জল আসছে চোখে ?
পরিদর্শনের কাজে দূরে গেছে অরুণ ।
ফিরে স্নান খাওয়া করবে । সবিতার মা আসেনি, অরুণ বাড়ী
থাকলে একা হাতেই সবটা করে নিত । অবশ্য মুখ
চালাত একটানা । এই খোঁচাটুকু হয়ত অভ্যাস হয়ে যাবে সোমার । দমে আছে মন । দুটো রাত দুধ
পাউরুটি খেয়ে নেওয়া যাবে । সেজন্য নয়, আসলে
দূরে কোথাও ঘুরে আসতে ইচ্ছে করছে । উপায় নেই । ‘কৃষ্ণ-কথা কও
পাখি’ এই খাঁচাই নির্মম সত্য । কাল ক্ষোয়া ক্ষীর আর বড় বড়
পান্তুয়া এনেছিল গোয়ালা । দুধের দাম মাসকাবারি । কিন্তু নগদ ষোল টাকা দিয়ে আটখানা
পান্তুয়া কিনলও অরুণ । নিজে পাঁচখানা আর সোমার তিন খানাতেই পেট ভরে অস্থির ।
ছেলেবেলায় পান্তুয়া ভালবাসত । বেড়ানর নাম করে দোকানে গিয়ে খাওয়াতেন বাবা । আহ্লাদী
সোমা মুখ ঝামটা দিত, ‘খাব না যাও । এতো ছোট কেন ? একবারেই শেষ , কেন বড় পান্তুয়া খাওয়াতে পার না,
বাবা—’ বাবা হাসতেন । বলতেন,
‘বাড়ি চল না, মা’কে বলে
দেব !’ ফোঁস করে উঠত সোমা, ‘খবরদার’
। এটা সোমার মুদ্রাদোষ
।পান্তুয়া প্রীতির কথা শুনেছিল
অরুণ । কালও তেত্রিশ টাকা ছিল,ষোল চলে গেল
পান্তুয়ায় । ভোরে বেরোনোর সময় টিফিন-বাবদ দুটো টাকা নিলো । আছে মাত্র পনেরো । এই
দিয়ে কোন বাহ্য উপকরণ সম্ভব নয়, মনের কোন উপকরণ মেটানোই কি
সম্ভব ? স্টোভের ফিতে পুড়ে নেমে গেছে ।
কালির শীষ উঠে আরেকটা দিক যতক্ষণ জ্বলছিল, রান্নাটা
এগিয়ে নিতে পেরেছে । গরম স্টোভ খুলে ফিতে
তুলতে গিয়ে ভাপ লেগে নরম আঙুলগুলো ঝলসে গেছে । শুকনো লঙ্কা বাটার জ্বালা তো আছেই ।
পাগল পাগল লাগছে সোমার।এখনও ফিরছে না অরুণ । কোন মতে
যেটুকু রেঁধেছে, তার উষ্ণ আহ্বান ব্যাকুল করছে
গর্ভবতী উপোষী সোমাকে । অরুণ কে ফেলে খায় না সে । সম্পর্কের অন্যতম যোগসূত্র ।বেলা গড়াচ্ছে । দেহের তাপে গরম
হয়ে উঠেছে বিছানা, দুপুর । ক্লান্তি ।
এখনো আসছে না কেন অরুণ ? একবার বলেছিল, জাতীয় সড়কের ধাবাগুলোয় সস্তায় দারুণ রুটি তরকা পাওয়া যায় । কি করে জানল ?
কই, সোমাকে তো কখনও । না না কেউ হয়ত বলেছে
অরুণকে । আহা দায়িত্ব পালনের জন্য সদা উদব্যস্ত থাকতে হয় অরুণকে । সততা, দায়িত্বশীলতার জন্য ওকে ভালোলাগে সোমার । কত শখ সোমাকে ঘিরে । বছরে তিনটে
ভাল শাড়ী দেবে, পারে না । অনেকের দায়িত্ব ওর উপরে । সোমাকে
নিয়ে স্বপ্ন সফল হয় না । জিপে অফিসের পথে কোথাও পছন্দসই শাড়ী ঝোলানো দেখলে,
নেমে দামদর করে আসে । ম্লান হেসে সেই গল্প করে । অতি সাধারণ
মনোজগতেও কোথাও একছিটে মহত্ব বিশ্বস্ততা আছে অরুণের । এটুকু ছাড়া বাঁচত কই করে
সোমা ? এখনও ফিরল না অরুণ । বেলা গড়িয়ে
তিনটে । ওর পকেটে মাত্র দু’টাকা । হয়ত সোমার কথা
ভেবে কিছুই খায়নি সারাদিন । সোমা নিশ্চিত জানে, আজ মনে খুব
কষ্ট অরুণের । দ্বিতীয় বিবাহবার্ষিকী আজ । শাড়ী কিনতে চেয়েছিল হয়নি । বিশেষ কারণে
বাড়তি টাকা পাঠাতে হল, হাত খালি । এই নিরুপায় স্বপ্নটুকুই
সোমার অন্তর্ভূমিতে অরুণের প্রবেশপত্র ।গমগমিয়ে ফেরে অরুণ । জিপটা সশব্দে
বেরিয়ে যায় । দ্বার ঘণ্টা বাজে । অরুণ ডাকে, ‘খোল
শীগগির । সোমু... ও সোমু । কি করছ—’ অরুণের অধৈর্য আদুরে ডাকের মধ্যে
ধীর পায়ে নতদৃষ্টি, পরনে রক্তাম্বর,
সীমন্তিনী সোমা লোহার দরজার কাছে পৌছায় । তার যাবতীয় উপবাস ক্লিষ্ট
রমণীয়ত্ব নিয়ে । তালা খুলে সরে দাঁড়ায় । ভার বলে দৃষ্ট তোলে না । কিছুই খেয়াল করে না অরুণ । শাড়ি-বিশেষ,
সীঁথির ভাষা, উপোষী হাসির ম্লানতা, নত-চোখ, এসব চোখেই পড়ে না অরুণের । হাতের বড় টিফিন
বাটিখানা নিয়ে ব্যস্ত । অকারণ জোরে কথা বলছে । বলল, ‘ভাত
করেছ?’ উত্তরের অপেক্ষা না করেই বলে,
কাছে এসো, গন্ধ শুঁকে বলতো কি ? মাংস—’ সোমার নীরবতা টেরই পায়না সে ।
টিফিন-বাটিটা নিয়ে সোমার পাশ কাটিয়ে ঢুকতে ঢুকতে আপন মনে বলে চলে,
‘উঃ কি খিদে পেয়েছে রে বাবা । ভাত বাড়ো সোমু,
জলটা ঢেলেই আসছি । খেতে খেতে বলব মজাটা—’ ফেরিওয়ালার থেকে সস্তায় কেনা
টেবিল চেয়ার । এখন একদিকে সোমা । টেবিলে দুটো থালায় বাড়া ভাত । ঠাণ্ডা । বাটিতে
ডিমভাজার টুকরো দেওয়া আলুর দম । মধ্যমণি হয়ে বসে আছে অরুণের আনা টিফিন-বাটিটা ।
স্নানে কি বেশি দেরি হচ্ছে অরুণের ? এল । ডিমভাজা ছড়ানো আলুর দমটা
দেখতেই পেল না । বুকের উচ্চতায় টিফিন-বাটিটাকে তুলে সতর্ক চাপে খুলে ফেলল অরুণ ।
আচমকা ছড়িয়ে পড়া রান্না মাংসের সুগন্ধ নাকে টেনে নিয়ে বলল,
‘আঃ--!’ হটাৎ খুব লজ্জা পেয়ে গেল সোমার ।
কেন পেল ?
কারণটার মুখোমুখি হতে চাইল না সে । শুধু অনুভব করল, সংসারের মাপজোক যেন অসংলগ্ন । বিশ্ব জুড়ে কেবল খাবার টেবিল বিছানো এক ঝুল
মাখা ছবি । বিজলি-পাখার উড়ন্ত তীব্র ডানাগুলি যেন হটাৎ মোচড় খেয়ে উলটো দিকে আড়মোড়া
ভেঙে উঠল । অরুণ বলল,
‘বড্ড খিদে পেয়েছে, না সোমু ? কি করি বল । সাহা বাবু বললেন, মাংসটা একটু চেখে যান
স্যার । আমি বললুম, সোমুকে ফেলে আমি খাই না সাহা বাবু।’
কখনো তো ঘুষ-টুষ খাই না, কিন্তু সাহা বৌদি
পর্যন্ত এমন ঝুলোঝুলি শুরু করলেন যে না নিয়ে আসতে পারলুম না । অবশ্য সবাই ধন্য
ধন্য করতে লাগল আমার ভালবাসা দেখে । হাঃ হাঃ হাঃ – বলতে বলতে নিজেই হাতায় করে মাংস
বেড়ে নিল । টেবিলের অন্য বাটিটা নিয়ে সামান্য কৌতূহল দেখাতেও ভুলেছে । এই আসরে ওটা
অদৃশ্য হয়ে গেলেই স্বস্তি পেত সোমা । খিদের বোধ ভোঁতা হয়ে গিয়েছিল তার । জড়সড় হয়ে
বসে রইল । দ্রুত গ্রাস তুলল অরুণ । মাথা নিচু, রুগ্ন
দেখাচ্ছে সোমাকে । হটাৎ তাকিয়ে হৈ হৈ করে উঠল অরুণ, ‘এহে
একদম ভুলে গেছি রে সোমু । প্লীজ মাপ করে দে । আজকের শাড়ীটা সামনের মাসে ঠিক--’ মুখটা কি করুণ হয়ে উঠল অরুণের ?
এর তো দরকার নেই । শাড়ী, গয়না, অনুষ্ঠান, ভ্রমণ, এসব ব্যয়
সাপেক্ষ কিছুই তো দাবী নয় সোমার । শত অভাবেও শুধু শিল্প রুচিটুকুই বাঁচিয়ে রাখতে
চায় সে । এ কি কিনে নেওয়ার জিনিষ নাকি কোন ছলেই আদায় করা যায় একে ? নিষ্ঠা,
বিশ্বাস, কল্পনা সুষমায় যার বাসা ।অরুণের বিড়ম্বনা মুছিয়ে দিতে চাইল সোমা । কই দিয়ে মোছাবে ? শব্দ ছাড়া সোমার কিছুই যে নেই । বাবার কাছে পড়া মহাকাব্যের দৃশ্য ভেসে উঠল
তার মনে । উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার মুখ । অতি কোমল গলায় বলল, ‘শাড়ীর
জন্য দুঃখ কেন ? জান
তো শাড়ির লোভ নেই আমার । কালিদাসে আছে,
বিয়ের পর শিবের সামনে নতুন বউ উমার যখন খুব লজ্জা করছিল—’সোমা বলতে চেয়েছিল, ‘ শিবের প্রেম-দৃষ্টির সামনে
প্রথম সমাগত উমা লজ্জায় স্বামীকেই জড়িয়ে নিতে চেয়েছিলেন শাড়ীর মতো’, বলা হল না । শাড়ি প্রসঙ্গ থেকে বহুদূর , মহা কবির
শিল্পলোকের বাইরে, উমা-মহেশের শিল্পিত দেহ বাসনার থেকে
সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রায়, ছিল তখন অরুণ । সোমার সত্তার
ব্যঞ্জনা, এমন কি তার নামের ইংরেজি অভিধার্থও সেখানে গৌণ । সেখানে তখন, অরুণ নিজের স্বাদগ্রন্থীগুলি ব্যবহার করে আসলে নিজের অভিধার্থকেই উপভোগ
করছিল বাস্তব জীবনে ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন